1a

বাংলাদেশের গ্রামীণ সালিশের রীতিনীতি ও মূল্যবোধগুলো প্রায়শঃ দেশের সাধারণ আইন ও রীতি বহির্ভূত হয়ে থাকে। এখানে পক্ষপাতিত্বের ঘটনা যেমন ঘটে, তেমনি সালিশকারীরা নিজেদের সিদ্ধান্তও প্রায় ক্ষেত্রে চাপিয়ে দিতে পছন্দ করেন। আর তাঁদের এসব সিদ্ধান্ত মূলত সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুকূলেই গ্রহণ করা হয়।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে মাদারীপুর লিগ্যাল এইড এসোসিয়েশন (MLAA) এবং নাগরিক উদ্যোগ কে সাথে নিয়ে ওয়েভ ফাউন্ডেশন সম্প্রতি গ্রামীণ সালিশ বিষয়ে একটি উদ্ভাবনী প্রকল্প চালু করেছে। কমিউনিটি লিগ্যাল সার্ভিসেস (CLS) এর ‘প্রো-এ্যাকটিভ গ্রান্ট সাপোর্ট’ থেকে এই প্রকল্পে অর্থায়ন করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার জন্য সম্পূরক শক্তি ও সহযোগী হিসেবে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই একটি কার্যকর পন্থা। সমাজের মানুষের ভেঙে যাওয়া সম্পর্কগুলো এসব গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভবপর হচ্ছে।

ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে উল্লেখিত প্রকল্পটি মেহেরপুর, পিরোজপুর ও মাদারিপুর জেলার ১৫টি ইউনিয়নের সবক’টিতে স্থানীয় সংগঠন (CBOs) প্রতিষ্ঠা, ইউনিয়ন সালিশ কমিটি গঠন এবং গ্রামীণ সালিশ ব্যবস্থার টেকসই নীতি ও কর্মকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সংগঠনগুলো জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য টেকসই ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা পালন করবে সেটিই প্রত্যাশিত। এছাড়া সালিশের সঠিক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করা, দুর্নীতি হ্রাস এবং সিবিও কর্তৃক পরিচালিত সকল সালিশ বিচারের ক্ষেত্রে সাধারণ সামঞ্জস্য বিধান করাও স্থানীয় সংগঠনসমূহের প্রধান দায়িত্ব।

1b

এই প্রকল্পের আইন সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের ফলে ডিসেম্বর ২০১৬ নাগাদ ২১ হাজারের অধিক মানুষকে সামাজিক সালিশ বিষয়ে সংবেদনশীল ও সচেতন করা সম্ভব হয়েছে। গ্রামীণ সালিশকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার সম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে এই কাজটি করা হয়েছে।

সম্প্রতি গ্রামীণ সালিশের প্রায় ৩৫০টির মতো মামলার তথ্য এসেছে এবং এসব মামলার অধিকাংশই যথাযথ সালিশ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া সালিশ বিচারের যাবতীয় তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। দেখা গেছে যে, নিষ্পত্তিকৃত এসব মামলায় বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষই আসলে বিজয়ী হয়েছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে একটি টেকসই বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকে আরও জোরদার ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।

এছাড়া একটি জাতীয় পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের মাধ্যমে এসব গ্রামীণ সালিশ পরিচালনাকারী দল বা টিমের এক্তিয়ার ও গঠনকাঠামো সম্পর্কে সাধারণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। আইনগত স্বীকৃতি অর্জনসহ গ্রামীণ সালিশ ব্যবস্থার একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত এডভোকেসি ও প্রচারাভিযানও ছিল এই প্রকল্পের একটি অন্যতম প্রধান মাইলফলক। স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকে টেকসই করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি উন্নত সেবা প্রদানে তৎপর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কাজটি নিরলসভাবে করে আসছে।